রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সফল হতে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং

একটা প্রচলিত ধারনা,

বাংলাদেশে খাবার ব্যবসার নাকি কোন লস নেই।

আপনি যাই বানাবেন, আমজনতা শুধু খাবে না চেটে পুটে খাবে। তাই প্রতিদিন নতুন নতুন রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে, লাউঞ্জ চালু হচ্ছে। এদের মধ্যে ছাপড়ার খাবার হোটেল যেমন আছে, ঠিক তেমনি বড় বিল্ডিং চোখ ধাঁধানো পরিবেশে মজাদার সব বিদেশি খাবার নিয়ে চাইনীজ, থাই রেস্টুরেন্ট, বিস্ট্রো কিংবা ক্যাফে ও আছে।

প্রশ্ন হচ্ছে,

ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাওয়া রেস্টুরেন্ট থেকে আপনার রেস্টুরেন্টে গ্রাহক আনবেন কিভাবে?

অথবা,

নতুন যে আইটেমটি আপনি এনেছেন তা কিভাবে আপনার গ্রাহককে জানাবেন?

রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় সফল হতে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং
রেস্টুরেন্ট কিংবা ক্যাফের জন্যে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং”, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটু অবাক লাগার মতোই ঘটনা কিন্তু গত ২ বছরে এই সেক্টরে বাংলাদেশে অসম্ভব বড় আকারের একটা পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে ঢাকা শহর কেন্দ্রিক খাবার ব্যাবসাতে। ঢাকা শহরে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত কিংবা সদ্য ওপেন হওয়া ভালোমানের সকল রেস্টুরেন্ট আর ক্যাফেগুলো ইতোমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এ বিনিয়োগ করা শুরু করেছে। সমস্যা হলো হাতে গোনা কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যাতীত বাকীগুলো সেইভাবে সফল হচ্ছে না।
এজেন্সীতে চাকুরীর সুবাদে ও ব্যাক্তিগতভাবে পরিচয়ের কারণে কিছু রেস্টুরেন্টকে গত কয়েকমাসে সোশ্যালমিডিয়া সার্ভিস দেয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই আজকের লেখা যার ফলাফল হিসেবে আছে যথেষ্ট ভালো কনভার্শনরেট ও ক্লায়েন্ট সেটিসফেকশান। মার্কেটটা যথেষ্ট বড় সুতরাং নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে একে অন্যের পাশে দাঁড়াতেই পারি।

ধরুন, আপনি এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং শুরু করতে যাচ্ছেন যারা শুধু বিভিন্ন রকম জুস আর কফি বিক্রী করেন। প্রথমের আপনার যে কাজটি করতে হবে তা হলো তাদের প্রতিটি আইটেমের উপরে নিজের অভিজ্ঞতা বাড়ানো।

অভিজ্ঞতাঃ

ক্লায়েন্টের ক্যাফেতে গিয়ে ৩/৪ দিনে তাদের প্রায় সকল আইটেম নিজেই টেস্ট করে নিন। একইসাথে একটা চেক লিস্ট করুন, ক্লায়েন্ট কি চাচ্ছে?? শুধুই কি বিক্রী বাড়ানো নাকি একইসাথে ব্র্যান্ড হিসেবে শক্ত প্রতিষ্ঠা?? অবাক হওয়ার কিছু নেই, অনেক রেস্টুরেন্ট কোটি কোটি টাকা নিয়ে ব্যবসায় নামছে আজকাল এবং যাদের লক্ষ্য থাকে পরবর্তীতে চেইন রেস্টুরেন্ট খোলা আর তাদের জন্যে শুধু বিক্রী বা কনভার্শন মূল কথা না একইসাথে শক্ত ভাবে ব্র্যান্ড পরিচিতি গড়াটাও একটা লক্ষ্য। চেকলিস্টে ফিরে যান এবং প্রথমেই দেখুন তাদের যে জুস বা কফির দামের ধরণ তাতে তাদের ক্রেতা আসলে কারা হবে তা নির্দিষ্ট করে ফেলা। যদি তারা এককাপ ক্যাপাচিনো ৪৫০ টাকাতে বিক্রী করে থাকে তবে অবশ্যই তাদের ক্রেতা হিসেবে কর্পোরেটরা সবচেয়ে ভালো টার্গেট। প্রথমেই নিজে তাদের প্রোডাক্ট টেস্ট করেছেন সুতরাং আসোলেই ৪৫০ টাকা দিয়ে তাদের থেকে কেও এককাপ ক্যাপাচিনো কেও কিনবে কি না সেইটাও যাচাই করে নিন। সকলের থেকে আলাদা আর ভালোমানের ক্যাপাচিনো হলে ৪৫০ টাকা দিয়েও এককাপ বিক্রী হতেই পারে। এইভাবে তাদের সব প্রোডাক্টের দাম দেখে আর কোয়ালিটি যাচাই করে গড়ে একটি ক্রেতা শ্রেণী তৈরী করুন।

ভালো ফুড ফটোগ্রাফীঃ
ফুড প্রোডাক্টের জন্যে ভালো মানের ছবি খুবই জরুরী। অন্য কোন রেস্টুরেন্টের ছবি নিয়ে ব্যবহার করা খুবই রিস্কী কারণ এতে আপনার ক্রেতারা বিষয়টি ধরে ফেললে আপনার রেস্টুরেন্টের রেপুটেশনের জন্যে খারাপ আর একইসাথে আপনার কম্পিটিটিটররা এইটাকে ইস্যুকরে আপনার ব্যবসার বিরুদ্ধে নেগেটিভ প্রচারণা চালাবে। সুতরাং খুব ভালো মানের একটা ফটোগ্রাফার এনে আপনার সবগুলো প্রোডাক্টের ছবি তুলে নিন বিভিন্ন ভাবে। এই ছবিগুলোই পরবর্তী কয়েকমাস আপনাকে ব্যবহার করতে হতে পারে সুতরাং বিভিন্ন এঙ্গেলে তুলে নিন। টপ ভিউ ছবি নিবেন আর এমন ভাবে ছবিগুলো নিবেন যাতে একইসাথে ছবিতে আপনার রেস্টুরেন্টের পরিবেশের ছবিও পাওয়া যায়। (রোড-সাইড কার্ট হলে তো আর পরিবেশ দেখানোর কিছু নেই, সেইক্ষেত্রে শুধু খাবারের ভালো করে ছবি নিন)। মাথায় রাখবেন যে ঢাকা শহরে এই শহরবাসীর সময় কাটানোর জন্যে রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাওয়া ব্যাতীত আর কোয়ালিটি কোন উপায় নেই সুতরাং পরিবেশটা ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারলে আপনার লক্ষ্যের দিকে অনেকটাই এগিয়ে যেতে পারবেন।

এইবার চেকলিস্টে কিভাবে আপনি আগাবেন তার তালিকা করেন। যদি রেস্টুরেন্টের আগের সোশ্যাল-ফুট প্রিন্ট থেকে থাকে তাহলে দেখুন যে সেইটার ক্যারেক্টারস্টিক কি? আগে তারা যেভাবে এগুতো সেইভাবে এগুবেন কি না সেইটাও নির্ধারণ করুন। আর যদি, সোশ্যালে একেবারেই নতুন হয় তাহলে আপনার তোলা ছবিগুলো থেকেই ফটোশপের হেল্প নিয়ে খুব ভালো মানের একটা করে কভার ফটো আর প্রোফাইল ফটো তৈরী করে নিন। যেহেতু প্রেক্ষাপট ঢাকা সুতরাং ফেসবুক এখনো কার্যকরী অতএব, ফেসবুককে সোশ্যাল মাধ্যম ধরেই বাকীটা লেখি।

এইবার, আবার চেক লিস্টে আসুন, এপসে অবশ্যই ম্যেনু এপস যোগ করে, সঠিক ভাবে মেন্যুটি লেখে রাখুন। কোন ভুল না মিথ্যা দাম মেন্যুতে রাখবেন না। ৪৫০ টাকার ক্যাপাচিনো কফি বিক্রী করবে যারা তাদের ক্রিয়েটিভ কাজ অবশ্যই ভালো মানের হতে হবে। জাস্ট ছবি তুলেই পোষ্ট করলেই হবে না বরং যে ছবিগুলো পোষ্ট করা দরকার সেইগুলো ধীরে ধীরে ফটোশপে এডিট করতে হবে আর আপনার রেস্টুরেন্টের লোগো আর ওয়াটারমার্ক ব্যবহার করুন। প্রথমেই পেজ স্পন্সর না করে বরং নিজের বন্ধুবান্ধব আর পরিচিতজনদের মাঝে শেয়ার করুন। প্রথম ২/৩ হাজার ফলোয়ার পাওয়ার ক্ষেত্রে আপনার টার্গেট গ্রুপ নিয়ে ভাবার দরকার নাই। বরং প্রথম ৩ হাজার ফলোয়ারের ফ্রেন্ড লিস্টে যদি গড়ে ৫০ টা করে ফ্রেন্ড থাকে তার মানে দেড়লক্ষ ফলোয়ারের কাছে পৌঁছাতে হবে প্রথমে। মিনিমাম ২ হাজার ফলোয়ার পেজে আনার পরে, আপনি টার্গেট গ্রুপ হিসেব করে আগানো শুরু করতে পারেন। পেজটা প্রস্তুত হলে, রেস্টুরেন্টের মালিককে বলুন যেনো, রেস্টুরেন্টে একটা নোটিশ দিয়ে দেয় যে, রেস্টুরেন্টে নতুন অবস্থাতে ২/১ জন গ্রাহক যাই আসুক না কেনো তারা যেনো রেস্টুরেন্টের পেজে গিয়ে রিভিউ বা চেক ইন দিলে রেস্টুরেন্ট ১০% ডিসকাউন্ট দিবে। এর মাধ্যেমে খুব সহজেই আপনি আপনার টার্গেট গ্রুপের কাছে পৌঁছে যাবেন। একইসাথে আপনিও সময় ধরে ধরে একে একে বিভিন্ন পোষ্টের মাধ্যমে আপনার বিভিন্ন রকম খাবারের ছবি পেজে পোষ্ট করতে শুরু করে দিন। এই পোষ্টগুলো বুস্ট করতে পারেন। রেস্টুরেন্টের ক্ষেত্রে পাওয়ার এডিটর ব্যবহার না করে সেই পুরনো ভাবে পোষ্ট বুস্ট করাটাই বেশি কার্যকরী। বুস্ট করার সময়ে ইন্টারেস্টগ্রুপ আর লোকেশন ঠিক করে দিতে ভুলবেন না। ধানমন্ডির রেস্টুরেন্টের জন্যে পুরো বাংলাদেশ টার্গেট করে বুস্ট দেয়া শুধুই অর্থের অপচয়।
কন্টেন্ট গুলো ইনফর্মেটিভ করে রাখুন, শুধুই কন্টেন্ট না দিয়ে একইসাথে সেই প্রোডাক্টের প্রাইজ কতো, খেতে কেমন লাগে তাও উল্লেখ করে দিন। আপনার যদি লাঞ্চে সেট ম্যেনু থাকে তবে লাঞ্চের ২/৩ ঘন্টা আগেই সেট মেন্যুর কন্টেন্ট পোষ্ট করুন। এইবার, সোশ্যাল গ্রুপগুলোর দিকে লক্ষ্য করুন। বাংলাদেশে ফুড ব্যাঙ্ক, ফুডিস সহ এই রকম কিছু সোশ্যাল ফুড গ্রুপ রয়েছে এবং বিশ্বাস করুন আপনার ৫০%+ গ্রাহক রয়েছে এই গ্রুপগুলোতেই। এই গ্রুপের এডমিনদের সাথে যোগাযোগ করে এই গ্রুপ মেম্বারদের জন্যে ডিসকাউন্ট দেয়ার ব্যবস্থা করুন। রেস্টুরেন্ট ব্যবসাতে ১০% ডিসকাউন্ট দিয়ে কোনদিনই মালিক পক্ষের লস হয় না বরং আপনি আপনার সবচেয়ে বড় ক্রেতা প্লেসে আপনার রেস্টুরেন্টকে পরিচিত করতে পারছেন। যতদিন পারেন ততদিনই রিভিউ আর চেকইনে ডিসকাউন্ট রাখুন। (আপনার ফুড কোয়ালিটি বাজে হলে এই রিভিউ আর চেকইন আপনার জন্যে বুমেরাং হয়ে আসবে কয়দিন পর, সুতরাং কোয়ালিটির ব্যাপারেও নজর রাখুন)।
অনেকগুলো সোশ্যাল গ্রুপ রয়েছে যেখানে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টের ডীলগুলো রাখা হয়, এই গ্রুপগুলোতে আপনার রেস্টুরেন্টের আকর্ষণীয় ডীল আর অফার সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে রাখুন। তারা যখন শেয়ার করবে এতেও আপনার টার্গেট গ্রুপের কাছে আপনি পৌঁছাতে পারবেন সহজেই।

এত্ত বড় হচ্ছে কেনো লেখাটা। ভেবেছিলাম অল্পতেই জানানো হয়ে সব কিন্তু এখনো অনেক কিছু বাকী রয়ে যাচ্ছে রেস্টুরেন্ট সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং সম্পর্কে। ঠিক আছে, এখন পর্যন্ত যেটুকু দিয়েছি তা যদি ভালো লাগে তবে কয়দিনের মধ্যেই ঈদের ছুটিতে এই নিয়ে বিস্তারিত লেখবো পরের খন্ডে।

 

লিখেছেনঃ শাহ শাইফুল্লাহ আল জাকেরিন প্রিথেল zakerinbd.blogspot.com/2015/07/blog-post.html

আপনার মতামত ...