‘জানালা দিয়ে নেট আসে, সরে দাড়ান’

‘এখানে দাঁড়াবেন না, এদিক দিয়ে নেট আসছে। সরেন, না হলে আপনাদের টিকিট পেতে দেরি হবে।’

টিকিট নেওয়ার জন্য গাইবান্ধা স্টেশনের কাউন্টারে ছোট্ট জানালামতো জায়গাটা ঘিরে দাঁড়ানো কয়েকজনের উদ্দেশে সেখানকার বুকিং সহকারী ফজলুল হকের কথাগুলো ছাপা হয়েছে একটি অনলাইন মিডিয়ায়। ফজলুল হকের বরাত দিয়ে ওই পত্রিকা আরও লিখেছে,

‘জানালার দক্ষিণ-পশ্চিম দিক দিয়ে নেট (ইন্টারনেট) আসে।’

কাজেই ওদিকে দাঁড়ালে ইন্টারনেট বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে

‘অনলাইনে টিকিট সেল করতে খুবই যন্ত্রণা হয়। কখনো কখনো একটি টিকিট দিতেও কয়েক মিনিট চলে যায়।’

(বাংলানিউজ, ১৬ আগস্ট)

ফজলুল হকের এ কথা কয় দিন ধরেই আমার মাথায় ঘুরছে। কেবল সুষ্ঠু পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও নজরদারির অভাবে একটি দেশের ইন্টারনেট ব্যবস্থা কীভাবে বিপর্যস্ত হতে পারে, তা এই উক্তিটিতে উঠে এসেছে। অথচ ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন কেবল সর্বব্যাপী দ্রুতগতির ইন্টারনেটের মাধ্যমেই সম্ভব।

ইন্টারনেট নিয়ে ফজলুল হকের কথার প্রতিফলন পাওয়া গেল একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনেও। ওকলা নামের একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান প্রতি মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইন্টারনেট গতির একটি সূচক প্রকাশ করে। বিভিন্ন দেশের ব্যবহারকারীরা তাদের ইন্টারনেটের গতি জানার জন্য ওকলার ‘স্পিডটেস্ট’ নামের অ্যাপ্লিকেশনটি ব্যবহার করে। এর ভিত্তিতে জুলাই মাসের প্রতিবেদনে (<http://www. speedtest. net/global-index>) দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের ১২২টি দেশের মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট গতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ১২০তম। সব প্রতিবেশীসহ আফগানিস্তানের অবস্থানও আমাদের ওপরে। আর ফিক্সড ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট গতিতে বিশ্বের ১৩৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৮তম।

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) হিসাব অনুসারে এখন দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭ কোটি ৩৩ লাখ। এর মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেটে গ্রাহক ৬ কোটি ৮৬ লাখ এবং ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার বা আইএসপিদের গ্রাহকসংখ্যা ৪৬ লাখ। এই সাড়ে ৭ কোটি ইন্টারনেট গ্রাহকের ব্যবহৃত মোট ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের পরিমাণ ৪২৬ জিবিপিএস। এর মধ্যে মোবাইলে ব্যবহার মাত্র ১১০ জিবিপিএস ও আইএসপির গ্রাহকদের বাকিটা। এর মানে ৯৩ শতাংশ মোবাইল গ্রাহক মাত্র
২৬ শতাংশ ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করছে। ১৩ গুণ বেশি মোবাইল গ্রাহকের ব্যান্ডউইথের ব্যবহার আইএসপি গ্রাহকের তিন ভাগের এক ভাগ মাত্র!

এরই মধ্যে ৩১ জুলাই প্রথম আলোতে ‘ইন্টারনেট ব্যবসার খরচ বাড়বে’ শীর্ষক এক সংবাদে জানা গেছে, আইএসপির লাইসেন্স ফি ১০ থেকে ২৫ গুণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সারা দেশে ইন্টারনেট সেবা দিতে পারে, এমন নেশনওয়াইড আইএসপির জন্য নতুন লাইসেন্স ফি ঠিক করা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। এ ধরনের আইএসপির বার্ষিক লাইসেন্স নবায়ন ফি হবে ৫ লাখ টাকা। দুই ক্ষেত্রেই এর আগের ফি ছিল ১ লাখ টাকা করে। অর্থাৎ বাড়ানো হলো ২৫ গুণ! সেন্ট্রাল জোন আইএসপির নতুন লাইসেন্স ফি ১৫ লাখ ও লাইসেন্স নবায়ন ফি ৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আর জোনাল আইএসপির নতুন লাইসেন্স ফি ১০ লাখ ও নবায়ন ফি ২ লাখ টাকা করা হবে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে এখন থেকে বাড়তি লাইসেন্স ফি ছাড়াও এসব প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেটের ব্যবসা করে বছরে যা আয় করবে, তার ১ শতাংশ অর্থ রাজস্ব ভাগাভাগি হিসেবে বিটিআরসিকে এবং আরও ১ শতাংশ বিটিআরসির সামাজিক সুরক্ষা তহবিলে (এসওএফ) জমা দিতে হবে!

বিশ্বের ইতিহাসে আইএসপি লাইসেন্স ফি একবারে ২৫ গুণ বাড়ানো একটি নজিরবিহীন ঘটনাই কেবল নয়, এটি একটি বিশ্ব রেকর্ডও বটে। এ ছাড়া আইএসপির মতো কম মুনাফার প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের আর কোথাও রাজস্ব ভাগাভাগি করে বা সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলে টাকা দেয়, এমনটাও কখনো শোনা যায়নি। এ উদ্যোগের ফলে ভোক্তা পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম যে বিপুল পরিমাণে বেড়ে যাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর যেসব স্থানে দাম বাড়ানো সম্ভব হবে না, সেখানে সেবার মান কমিয়ে দেওয়া হবে।

বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট এখন মৌলিক অধিকার হিসেবেই স্বীকৃতি পাচ্ছে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের পরই এখন ‘সবার জন্য ব্রডব্যান্ডের’ নীতি নিচ্ছে সরকারগুলো। ইন্টারনেটের নানান সুবিধার মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বিশ্বব্যাপী প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এই প্রথমটি হচ্ছে সামাজিক সাম্য। ইন্টারনেট সামাজিক সমতা সম্প্রসারণে শিল্পবিপ্লবের চেয়েও বেশি শক্তিশালী। ইন্টারনেটে যুক্ত হওয়ার পর গ্রাহকের বর্ণ কিংবা লিঙ্গের ব্যাপারটা আলাদা কোনো দ্যোতনা সৃষ্টি করে না। ইন্টারনেটের দ্বিতীয় শক্তি হলো কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও ব্যবসা করার প্রতিকূলতাকে কমিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা। বলা হয়, প্রতি এক হাজার নতুন সংযোগ আটটি নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে। কেবল তা-ই নয়, ১০ শতাংশ ব্রডব্যান্ডের বৃদ্ধি জাতীয় আয়ের ১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। ইন্টারনেটের প্রভাবে আত্মকর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধিও বিপুলভাবে বাড়ে। বিগত কয়েক বছরে দেশে ফেসবুকভিত্তিক বাণিজ্য উদ্যোগের সংখ্যাবৃদ্ধি দেখে সেটির প্রমাণ পাওয়া যায়। সর্বশেষ হলো শিক্ষার বিস্তার। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করে মানসম্মত শিক্ষাকে সবার জন্য সহজপ্রাপ্য করার সংগ্রামকে বেগবান করেছে ইন্টারনেট। এসব কারণে দেশে দেশে ব্রডব্যান্ডকে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশই হয়তো এর ব্যতিক্রম। কারণ হলো, যে সংস্থার এই কাজগুলো করার কথা, তারা ‘অন্য কাজে’ ব্যস্ত।

২০০৯ সালে সরকার গঠনের পরপরই বর্তমান সরকার একটি যুগোপযোগী ব্রডব্যান্ড নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করে। এর আওতায় বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার ফলে চালু হয় তৃতীয় প্রজন্মের মোবাইল সেবা, সম্প্রসারিত হয় ব্রডব্যান্ডের সীমানা এবং ক্রমান্বয়ে দেশে একমাত্র সাবমেরিন কেবলের বিকল্প সংযোগও পাওয়া যায়। দুর্ভাগ্য হলো, ওই নীতিমালা ২০১৫ সালে তামাদি হয়ে যাওয়ার পরও আজ পর্যন্ত সেটিকে হালনাগাদ করার কোনো উদ্যোগ নেই। ওই নীতিমালার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কোনো হিসাব-নিকাশ হয়েছে কি না, সেটাও জানা যায়নি। অথচ একই সময়ে প্রণীত তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি নীতিমালা এরই মধ্যে একবার পরিমার্জিত হয়ে নতুনভাবে গৃহীত হয়েছে এবং সেটিরও হালনাগাদ করার কার্যক্রম সম্প্রতি শুরু করেছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ। জাতীয় টেলিকম নীতিমালা তামাদি হয়ে গেছে ২০১০ সালেই। সেটিও হালনাগাদ করার কোনো উদ্যোগ বিটিআরসি বা টেলিযোগাযোগ বিভাগ গ্রহণ করেনি।

অথচ এই দুটি নীতিমালা দ্রুততার সঙ্গে হালনাগাদ করে সারা দেশে ব্রডব্যান্ড সম্প্রসারণ, তৃতীয় প্রজন্মের মোবাইল সেবা ছড়িয়ে না পড়ার কারণ বের করে অল্প সময়ের মধ্যে চতুর্থ ও পঞ্চম প্রজন্মের সেবা চালু করা এখন সময়ের দাবি। অথচ এসব দিকে নজর না দিয়ে বিটিআরসি অহেতুক ইন্টারনেটের খরচ বাড়ানোর নীতি বাস্তবায়নে ব্যস্ত।

মুনির হাসান: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি

আপনার মতামত ...