ব্র্যান্ড পণ্যের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর সেরা ১৪টি উপায়

আপনি যখন ক্যামেরা ফিল্মের কথা ভাবেন তখন আপনার মনে কি কোডাকের কথা ভেসে উঠে? কিংবা যখন কোন কোমল পানীয়ের কথা চিন্তা করেন সবার আগে কোকের কথা মাথায় আসে? আজকাল কিছু কিছু ব্র্যান্ড এতটাই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে যে, আমরা কোন দ্রব্যের আসল নামের জায়গায় কোন স্বনামধন্য ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে বসি।

মূলত প্রতিটি ব্র্যান্ড কোম্পানির মূল লক্ষ্য থাকে তাদের পণ্যকে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা লাভ করানো। আপনার নিজস্ব ব্র্যান্ডের পণ্যটিও পেতে পারে বিপুল জনপ্রিয়তা। টেকমাস্টারব্লগ আজকের পোষ্টে পণ্যের জনপ্রিয়তার বাড়ানোর কয়েকটি সহজ উপায় সম্বন্দে প্রয়োজনিয় কিছু ট্রিক্স জানাবে, যা নিম্নে দেয়া হলঃ

১. ভোক্তার চাহিদাকে প্রাধান্য দেয়াঃ


আপনি আপনার ব্র্যান্ডকে কি চোখে দেখেন তা মুখ্য বিষয় নয়; বরং ভোক্তা আপনার ব্র্যান্ডেড পণ্য সম্পর্কে কি ধারণা পোষণ করে তাই মুখ্য। তাই সবার আগে আপনাকে জানতে হবে আপনার পণ্য ও সেবা সম্পর্কে ভোক্তার মতামত। এর জন্য আপনি কোম্পানির সবার সাথে আলোচনা, পর্যালোচনা ও নিজের ব্র্যান্ড সম্পর্কে যাচাই-বাছাই করতে পারেন।

২. বিনামুল্যে পণ্য বিক্রিঃ


আপনি যদি নতুন কোন পণ্যের ব্যবসা শুরু করে থাকেন তাহলে আপনার পণ্যটির নমুনা বিনামূল্যে বাজারে ছেড়ে দিন। এতে করে ভোক্তা আপনার পণ্যটি সম্পর্কে অবগত হবে এবং এর মান যাচাই করতে পারবে। পণ্যের নমুনা তৈরি করে তা বিনামূল্যে বিক্রি করা ও স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে তা সবার দ্বারে দ্বারে তা পৌছে দেওয়া পণ্য বাজারজাতকরণের প্রাচীনতম কৌশল।

এই ক্ষেত্রে একটু লোকসান হয়। তবে এ লোকসান আপনি কাটিয়ে উঠতে পারবেন যখন আপনার পণ্যটি জনপ্রিয় হয়ে উঠবে এবং অনেক ভোক্তা আপনার পণ্যটি ব্যবহার শুরু করবেন। আপনার পণ্যটি যাতে ভাল মানসম্মত হয় সেই চেষ্টা করুণ। যাতে ভোক্তা আপনার পণ্যটি পাওয়ার জন্য অর্থ ব্যয়ে দ্বিধা বোধ না করে।

৩. ইনফোগ্রাফিক্স তৈরিঃ


আপনার ব্র্যান্ডের পণ্যটি কেনার সময় ভোক্তা পণ্যের উপরের লেবেল দেখে ক্রয় করবে। তাই সুন্দর ডিজাইনের ইনফোগ্রাফিক্স ব্যবহার করে পণ্যের লেবেলটি অনেক আকর্ষণীয় এবং তথ্যবহুল করা যায়। তবে অপ্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানের কোন প্রয়োজন নেই। কিছু সময় ও অর্থ ব্যয় করে কোন ভাল মানের ডিজাইনারের সহায়তায় আপনার পণ্যের ইনফোগ্রাফিক্সটি তৈরি করুণ।

অনলাইনে পণ্য বিক্রয়ে ইনফোগ্রাফিক্স সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে ভোক্তা শুধু বাহ্যিক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেই পণ্য ক্রয় করেন। তাই পণ্যটি দেখতে যত বেশি আকর্ষণীয় হবে, পণ্যটির চাহিদাও তত বেশি হবে।

৪. অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠাঃ


ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের জন্য অনলাইন ব্যবসা অনেক লাভজনক। কারণ সেখানে অনেক বাড়তি সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায়। ইন্সটাগ্রাম, ফেসবুক,টুইটার, পিন্টারেস্ট সহ যেকোন সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনার পণ্যটির বিজ্ঞাপন দিয়ে দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন। প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানের মাধ্যমে এবং ক্রেতাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে অনলাইনে ব্যবসা অনেক জমজমাট হয়ে উঠতে পারে।

তবে সকল প্রকার সোশ্যাল মিডিয়ায় এক সাথে আপনি সমান ভাবে তাল মিলিয়ে কাজ করতে পারবেন না। তাই আপনার উচিত সুবিধা মতো যেকোনো একটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবসায় পরিচালনা করা।

৫. রেফারেল প্রোগ্রাম চালু করাঃ


ভোক্তাকে আপনার পণ্য ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করার জন্য রেফারেল প্রোগ্রাম চালু করতে পারেন। অর্থাৎ যদি কোন ভোক্তা আপনার পণ্যটি ব্যবহার করার সাথে সাথে অন্যান্যদেরও আপনার পণ্যটি ব্যবহারে উৎসাহিত করে এবং তারা আপনার পণ্যটি ব্যবহার শুরু করে তাহলে উক্ত ভোক্তাকে পুরস্কৃত করুণ। এতে করে সবাই আপনার পণ্য সম্পর্কে জানবে ও অন্যকে জানাবে। মাইক্রোসফট ওয়ান ড্রাইভ ও ড্রপবক্সের বেলায় আমরা এ বিষয়টি লক্ষ্য করি। বর্তমানে তাদের মিলিয়ন সংখ্যক ভোক্তা রয়েছে।

৬. আকর্ষণীয় নাম ও প্রতিক (লোগো) ব্যবহারঃ


একটি ব্র্যান্ডের নাম ও প্রতিক (লোগো) অবশ্যই এমন হতে হবে যা সকলে মনে রাখতে পারে এবং চিনতে পারে। আপনার পণ্যের নাম ও প্রতিক-ই ভোক্তার মনে আপনার পণ্য সম্পর্কে প্রথম ছাপ ফেলবে। তাই চেষ্টা করুণ কোন আকর্ষণীয় নাম ও প্রতিক ব্যবহারের।

৭. পণ্য তৈরির কারণঃ


আপনার পণ্যটি তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার পেছনে যদি কোন সুন্দর ঘটনা থেকে থাকে তাহলে তা সবার সামনে তুলে ধরুন। বিশেষ করে পণ্যটি যদি কোন আবেগপ্রবণ ঘটনা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে আপনি তৈরি করে থাকেন, তাহলে তার প্রতি ভোক্তারা আকর্ষিত হয় বেশি। যেমন-আপনি এমন কী কী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন যার কারণে এই পণ্যটি তৈরি করেছেন তা ভোক্তাকে জানান। এতে করে ভোক্তারাও তাদের উক্ত সমস্যার সমাধানে আপনার পণ্যটি ব্যবহার করবে।

৮. সকলের চাহিদা পূরণ অসম্ভবঃ


এটা সবসময় মনে রাখা উচিত যে সকল ভোক্তা আপনার পণ্যটি পছন্দ করবেনা। কারণ প্রত্যেকের রুচি ও চাহিদা ভিন্ন।

তাই সব সময় একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর লোকের জন্য পন্য তৈরি করা উচিত। আপনার পণ্যের মান উন্নয়ন করুণ এবং ভোক্তার চাহিদা সম্পর্কে জানুন। মনে রাখবেন যে, আপনার কাজ হল সুষ্ঠুভাবে আপনার ব্যবসায় পরিচালনা করা, সকলকে সন্তুষ্ট করা নয়।

৯. গেস্ট পোস্টের মাধ্যমে ওয়েবসাইট বা ব্লগে বিজ্ঞাপনঃ


বিভিন্ন ওয়েবসাইট বা ব্লগে আপনার পণ্যের ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন দিয়ে শুরু করতে পারেন একটি ব্যতিক্রম ধর্মী প্রচারণা। আপনি যখন বেশ কিছুদিন একটি ব্যবসায়ের সাথে সম্পৃক্ত থাকেন, তখন ওই ব্যবসায় ক্ষেত্রের অনেক বিষয় সম্পর্কে আপনার ধারণা সৃষ্টি হয়। আপনি আপনার ব্যবসায় জীবনের নানা অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানগুলো নির্দিষ্ট ওয়েব বা ব্লগে লিখুন। তাতে আপনার পণ্যের গোপন কিছু তথ্যও তুলে ধরুন এবং কেনো বাজারের অন্যান্য পণ্যের তুলনায় আপনার পণ্যটি ভাল তাও লিখুন। নতুন নতুন উদ্যোগতারা এটি আগ্রহ নিয়ে পড়বে।  তখন আপনার পণ্যের জনপ্রিয়তা বাড়বে। ভোক্তারা আপনার পন্যটি কিনতে অধিক আগ্রহী হবে।

১০. অন্যান্য ব্যবসায়ীদের সাথে সম্পৃক্ততাঃ


আপনি যতই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হন না কেন আপনার উচিত অন্যান্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত থাকা ও তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা। তাদের বিভিন্ন প্রোগ্রামে নিজের ব্র্যান্ডের প্রচারণা করা। আবার নিজের কোন প্রোগ্রামে তাদের পণ্যের প্রচারণা করতে দেয়া। এতে উভয়ের পণ্য সম্পর্কে ভোক্তারা জানতে পারেন এবং উভয়ই লাভবান হয়। আপনার ব্র্যান্ডটি আরও বেশি পরিচিতি লাভের সুযোগ পায়।

১১. প্রতিযোগিতার আয়োজনঃ


বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজনের মাধ্যমে ক্রেতাদের পুরস্কৃত করলে ক্রেতারা পণ্যটি ক্রয়ে বেশি আগ্রহী হয়। এটি অনেকটা শর্ত সাপেক্ষে পণ্য বিক্রয়ের মতো। যেমন-

আপনি আপনার ব্র্যান্ডের ক্যামেরা ব্যবহার করে সেলফি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার জন্য ক্রেতাদের উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। তার বিনিময়ে সবচেয়ে বেশি সেলফি শেয়ারকারীকে দিতে পারেন বিশেষ মূল্যছাড় ও আকর্ষণীয় উপহার।

অথবা আপনার ব্র্যান্ড সম্পর্কে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাল মন্তব্য করলে তাদের মধ্য থেকে সেরা ১০ মন্তব্যকারীকে পুরস্কৃত করতে পারেন।

১২. প্রভাবশালী ব্যক্তির অনুমোদনঃ


ব্যবসায়িক প্রতিটি ক্ষেত্রে এমন কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি থাকেন যারা ভোক্তাদের উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। যেমন- কোন যশস্বী ব্যক্তি (সেলেব্রিটি) কিংবা কোন পণ্য বিশেষজ্ঞ। এমন কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি আপনার ব্র্যান্ডের প্রচারনা করলে আপনার পণ্যের বাজার স্বভাবতই বৃদ্ধি পাবে। আপনি যদি তাদেরকে আপনার পণ্যটি ব্যবহার করতে দেন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় (ইন্সটাগ্রাম বা ইউটিউব) আপনার পণ্য সম্পর্কে সৎ মন্তব্য করতে বলেন, তাহলে তাদের মাধ্যমে পণ্যটি ব্যাপক প্রচারণা লাভ করে। যাদের পণ্যের অধিক প্রচারনার প্রয়োজন তারা এ পদ্ধতির আশ্রয় নেয়।

১৩. “আমরা’ নয় “আপনারা” ব্যবহার করাঃ


বেশির ভাগ পণ্য ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যের জন্য ‘আমরা এটা করি’ ‘আমরা ওটা করি’-এ ধরণের বাক্য ব্যবহার করেন। ভোক্তারা কখনোই এ ধরণের প্রচারণায় আগ্রহ রাখেনা। তাই মনে রাখতে হবে যে, সব সময় ভোক্তার সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত, নিজেরটা নয়। তাই ‘ আপনার জন্য আজই এ পণ্যটি প্রয়োজন’ কিংবা ‘এ পণ্যটিই পারে আপনার সমস্যা সমাধান করতে’-এ ধরণের বাক্য ব্যবহার করুন। এভাবে আপনি ভোক্তার প্রয়োজনকে সবার আগে প্রাধান্য দিতে পারেন ও তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন।

১৪. কৃতজ্ঞতা প্রকাশঃ


ব্যবসায় ক্ষেত্রে “ধন্যবাদ-কথাটির গুরুত্ব কল্পনাতীত। আপনার দোকান বা ওয়েবসাইট থেকে প্রতিবার পণ্য ক্রয়ের পর ক্রেতাকে ধন্যবাদ দিন। প্রয়োজনে ৫-১০% মূল্যহ্রাসের বিশেষ কার্ড দিন। তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করুণ। এতে করে তারা পরবর্তীতে আবার আপনার পণ্যটি ক্রয়ে উৎসাহিত হবে। এভাবে আপনি যে শুধু কৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করলেন তা নয়; বরং ক্রেতাটিকে আবার আপনার পণ্যটি কিনতে আসার সুযোগ সৃষ্টি করে দিলেন।

আশা করি এ টিপসগুলো আপনার ব্র্যান্ডের জনপ্রিয়তা বাড়াতে আপনাকে সাহায্য করবে। সেই সাথে আপনার ব্যবসায় ও লাভবান হবে। তবে ব্যবসায় কাজে হোক আর অন্য যেকোনো কাজেই হোক, সাফল্য লাভের মূলমন্ত্র হল নিজের কাজকে ভালোবাসা।

3 thoughts on “ব্র্যান্ড পণ্যের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর সেরা ১৪টি উপায়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।