৫জি তে স্বাস্থ্য ঝুকির আদ্যোপান্ত

বর্তমান আধুনিক পৃথিবীতে দ্রুত গতিতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে টেলি নেটওয়ার্ক এর সংখ্যা। বাড়ছে টেলি নেটওয়ার্ক এর গতি। গতির ক্ষেত্রে ৪র্থ প্রজন্ম পেড়িয়ে আমরা এখন ৫ম প্রজন্মে প্রবেশ করেছি।

টেলি নেটওয়ার্ক সংখ্যা ও এর গতি বৃদ্ধির সাথে বেড়েছে নেটওয়ার্ক এর টাওয়ার সংখ্যা। এসব টাওয়ারগুলো একটি নির্দিষ্ট এলাকার সকল নেটওয়ার্ক ডিভাইস কভার করে। একটি নির্দিষ্ট এলাকা কভার করার জন্য এগুলো ক্ষতিকর রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরন করে। যা ৫জি এর ক্ষেত্রে অন্যান্য সকল প্রজন্মের বিকিরন থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

চলুন এ বিষয়ে কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক।

৫জি নেটওয়ার্ক কি ?

কয়েক বছর ধরেই ৫জি বা ৫ম প্রজন্মের নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি টেলিকম বিভাগে বেশ আলোচিত। তবে এবছর থেকেই মূলত এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এটিএন্ডটি, ভেরিজন এবং স্প্রিন্ট এর মত টেলিকম প্রতিষ্ঠানগুলো এই বছরের প্রথমার্ধেই ৫জি নেটওয়ার্ক স্থাপন করেছে। এই বছরের শেষার্ধে ৫জি নেটওয়ার্ক সকল স্তরেই পৌঁছে যাবে বলে ধারনা করা যাচ্ছে।

নেটওয়ার্ক এর কার্যকারীতা প্রায় ১০ গুন পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে ৫ জি প্রযুক্তিতে। ১০ এমবিপিএস গতি নিয়ে ২০০৯ সালে ৪জি নেটওয়ার্ক প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটে। বর্তমানে ৫জি নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে৷ এর গতি ১০ থেকে ২০ জিবিপিএস পর্যন্ত হতে পারে। এই প্রযুক্তিতে ৩০ মিলিসেকেন্ড থেকে ১ মিলিসেকেন্ডে নামিয়ে আনা সম্ভব। যা অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিং ও অনলাইন ভিডিও গেমিং এর ক্ষেত্রে খুবই কার্যকর।

রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি কি ?

৩ কিলোহার্জ থেকে ৩০০ গিগাহার্জ পর্যন্ত  ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বর্ণালীকে রেডিও বর্ণালী বলা হয়। এই সীমার মধ্যবর্তী তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গকে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বলা হয়। আধুনিক প্রযুক্তিতে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির প্রচুর ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে টেলিকম ব্যবস্থা রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির উপর নির্ভর করেই চলছে।

রেডিও বর্ণালীকে ১২ টি ফ্রিকোয়েন্সিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে সব ফ্রিকোয়েন্সি ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করে না। তবে হাই ফ্রিকোয়েন্সিতে ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি হতে পারে। যার ফ্রিকোয়েন্সি হল ৩ মেগা থেকে ৩০ মেগাহার্জ।

রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরনের ক্ষতিকর দিকঃ

টেলিকম নেটওয়ার্ক এর উদ্বেগের কারণ হচ্ছে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরন। ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক বর্ণালী থেকে নির্গত মাইক্রোওয়েভ, এক্স রে, রেডিও তরঙ্গ সবই রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরন। এমনকি কম্পিউটার ও ল্যাপটপের মনিটর থেকে নির্গত আলো এগুলোও রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরন এর উদাহরন।

সব ধরনের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরন ক্ষতির কারন হয় না। বিজ্ঞানীদের মতে, কোন নির্দিষ্ট রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরন ক্ষতিকর কিনা তা বোঝার সহজ উপায় হল এটি আয়োনাইজিং বা নন আয়োনাইজিং বিকিরন কোন বিভাগের তা বিবেচনা করা।

অতিবেগুনী, দৃশ্যমান আলো, ইনফ্রারেড এর মত নন আয়োনাইজিং বিকিরন রাসায়নিক বন্ধন ভাঙ্গার পক্ষে খুব দুর্বল। এদের ক্ষতিকর প্রভাব কম। এক্স রে, গামা রশ্মি, ইউভি বিকিরনের উপরের ফ্রিকোয়েন্সিগুলি আয়োনাইজিং বিকিরন।

আয়োনাইজিং বিকিরনগুলো ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই বিকিরন জীব কোষকে ধ্বংস করতে পারে। এমনকি ডিএনএ পরিবর্তনের কারনও হতে পারে আয়োনাইজিং বিকিরনগুলো।

টেলিকম রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরন গবেষণায় দেখা গেছে উচ্চ মাত্রার ৩ জি রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরন এর ফলে মানুষের অ্যাড্রেনাল গ্রন্থিতে ক্যান্সার, হার্ট টিউমার, মস্তিষ্কের টিউমার এর মত রোগ রোগ হতে পারে।

৫জি নেটওয়ার্ক কতটুকু ক্ষতিকর ?

পূর্ব প্রজন্মের টেলিকম নেটওয়ার্কের মতো ৫জি নেটওয়ার্কও রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরন এর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অ্যান্টেনা এবং মোবাইল ফোন সেটের মধ্যে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক বর্নালী প্রবাহিত হয়।

৫জি নেটওয়ার্ক রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি শহরাঞ্চলে খুব বেশি দূর যেতে পারে না। তাই এই ফ্রিকোয়েন্সি ছড়িয়ে দেবার জন্য অনেক বেশি টাওয়ার ব্যবহার করতে হয়। যা ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বর্নালীর রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরন অংশের মধ্যে যেটির ফ্রিকোয়েন্সি যত বেশি জীবের পক্ষে সেটি তত বেশি ক্ষতিকর। বিজ্ঞানীদের এক পর্যবেক্ষনে দেখা গেছে ১জি, ২জি, ৩জি, ৪জি নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি ১ থেকে ৫ গিগাহার্জ ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে। যেখানে ৫জি নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি ২৪ থেকে ৯০ গিগাহার্জ ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে। যা খুবই উদ্বেগজনক।

তবে আশার কথা হচ্ছে, ৫জি নেটওয়ার্কে কম ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার এর কথা চলছে। ৫জি নেটওয়ার্কের ফ্রিকোয়েন্সি দৃশ্যমান আলোর চেয়ে কম ফ্রিকোয়েন্সি হবে বলে জানা যায়। অর্থ্যাৎ ৫জি নেটওয়ার্ক রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরনে সূর্যের আলোর তুলনায় ক্ষতি কম হবে।

এছাড়া সম্প্রতি করোনাভাইরাস ছড়ানোর সাথে ৫জি নেটওয়ার্ক এর যে সম্পর্ক রয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে এখনও তার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ ৫জি নেটওয়ার্ক প্রযুক্তির সাথে করোনাভাইরাস এর কোন সম্পর্ক নেই।

৫জি নেটওয়ার্ক রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরন নিয়ে এখনও বিশদ গবেষনা চলছে। এর ক্ষতিকর প্রভাব হয়ত একেবারে দূর করা যাবে না, তবে ক্ষতি যতটুকু কমিয়ে আনা যায় সে বিষয়ক কাজ করে যাচ্ছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।